ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ইন্টারনেট প্রযুক্তিনির্ভর একটি বিশেষ মশার ফাঁদ উদ্ভাবন করেছেন, যা ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি নিরূপণে আগাম সতর্কবার্তা দিতে সহায়তা করতে পারে। ‘মাস্ট-ক্লাউডনেট’ (MAST-CloudNet) নামের এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এডিস মশা শনাক্ত, ছবি সংগ্রহ ও সংখ্যা গণনা করা যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল (ইইই) বিভাগের মাইক্রোসিস্টেমস অ্যান্ড ন্যানোইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবের গবেষকেরা প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। গবেষকদের উদ্ভাবিত ফাঁদটি স্ত্রী এডিস মশার ডানার কম্পনের অনুরূপ শব্দ তৈরি করে পুরুষ এডিস মশাকে আকৃষ্ট করে। ফাঁদে মশা ধরা পড়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার ছবি ধারণ করা হয় এবং ছবিগুলো ক্লাউড সার্ভারে পাঠানো হয়। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেল ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে এডিস মশা শনাক্ত ও সংখ্যা গণনা করে। গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, নীরব ফাঁদের তুলনায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি এডিস মশা ধরা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিন দিনব্যাপী মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় ভারী বৃষ্টি ও বাতাসের মধ্যেও যন্ত্রটি নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছে। এ সময় ফাঁদে ধরা পড়া মোট মশার ৮৩ শতাংশই ছিল এডিস মশা। প্রযুক্তিটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর কম নির্মাণব্যয়। গবেষকদের তথ্যমতে, একটি ফাঁদ তৈরি করতে আনুমানিক এক হাজার টাকা খরচ হয়, যা প্রচলিত অনেক স্মার্ট মশার ফাঁদের তুলনায় কম। ফলে স্বল্প ব্যয়ে বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এই গবেষণার ফলাফল ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী IEEE Transactions on Instrumentation and Measurement-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণা প্রকল্পে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষকেরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রাণিবাগানে মশা লালন-পালন এবং মশাকে আকৃষ্ট করার উপযোগী শব্দ নির্বাচনে সহযোগিতা করেন। গবেষক দলের ইইই বিভাগের সদস্যরা হলেন—আতিক বি. জাকির, আসিফ রহমান দীপ্ত, ফাহাদ আরেফিন ও এ. এম. এম. মুনিফ খান। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সদস্যরা হলেন—নীলয় হাওলাদার, মো. সিউম সরকার ও আতিয়া শানজিদা শর্মি। গবেষণাটির সংশ্লিষ্ট লেখক হিসেবে রয়েছেন ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. সাঈদ মাহমুদ উল্লাহ, সহযোগী অধ্যাপক ড. আহসান হাবিব এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খন্দকার আশফাকুল মুইদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তহবিলের সহায়তায় পরিচালিত এই প্রকল্পের পরবর্তী ধাপে ২০২৭ সালের জুন ও জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আবাসিক এলাকাগুলোতে ১০ থেকে ১৫টি ফাঁদ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক এডিস মশার বিস্তার পর্যবেক্ষণ এবং ডেঙ্গুর ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।

গবেষকদের এই উদ্ভাবন বাস্তবায়িত হলে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে এডিস মশার বিস্তার পর্যবেক্ষণ আরও সহজ ও কার্যকর হতে পারে। তবে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আগাম পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা প্রয়োজন।