**ঢাকা** - শারদীয় দুর্গাপূজার আনন্দে যখন মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর আরাধনায় মেতে ওঠেন ভক্তরা, তখন পর্দার অন্তরালে থেকে যান যেসব শিল্পী , তাদের হাতেই প্রাণ পায় মৃণ্ময়ী দেবী। তেমনই এক প্রথাগত কারিগর ও আধুনিক ধারার শিল্পীর নাম আমিও পাল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা (Oriental Art) বিভাগের ৩৩তম ব্যাচের একজন শিক্ষার্থী।

একদিকে প্রাচ্যকলার একাডেমিক চর্চা, অন্যদিকে পরিবার সূত্রে পাওয়া প্রায় ১৫০ বছরের প্রতিমা তৈরির ঐতিহ্য, এ দুইয়ের মেলবন্ধনে প্রতিমা নির্মাণে নতুন মাত্রা যোগ করছেন তিনি। সম্প্রতি ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর 'ক্যাম্পাস' বিভাগের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের পারিবারিক ঐতিহ্য, ঢাবির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ ভাবনার কথা শেয়ার করেছেন এই তরুণ শিল্পী।

**১৫০ বছরের পারিবারিক ঐতিহ্য ও প্রথাগত শিক্ষা**

আমিও পালের শৈশব ও বেড়ে ওঠা কেটেছে বাবা অচিন্ত্য পাল এবং দাদুর প্রতিমা গড়ার কাজ দেখে। ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে প্রতিনিয়ত কাদা-মাটি, খড় ও বাঁশের কাজ দেখতে দেখতেই শিল্পকলার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ জন্মায়।

তিনি জানান, বই বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যা পাওয়া যায় না, বাবা-দাদুর কাছ থেকে তিনি অর্জন করেছেন সেই পারিবারিক ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান। বাবা অচিন্ত্য পালের কাছে তিনি শিখেছেন যে প্রতিমা তৈরি কেবল একটি শারীরিক শিল্পকর্ম নয়; এতে জড়িত রয়েছে আবেগ, অনুভূতি, বিশ্বাস ও ধৈর্য। মাটির আর্দ্রতা বোঝা, সঠিক মান নির্ণয় করা এবং প্রতিমার মুখের এক্সপ্রেশন বা অভিব্যক্তিতে প্রাণ ফুটিয়ে তোলার প্রথাগত কৌশল তিনি পরিবার থেকেই আয়ত্ত করেছেন।

**ঢাবির প্রাচ্যকলা ও চারুকলার প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব**

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ভর্তির পর আমিও পালের শিল্পচেতনায় যুক্ত হয় এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। একাডেমিক শিক্ষার অভিজ্ঞতা নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ঢাবিতে অঙ্কন (Drawing), ফর্ম, অনুপাত (Proportion), রং, কম্পোজিশন এবং শিল্পকলা ইতিহাস সম্পর্কে যে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন, তা তাঁর প্রতিমা নির্মাণকে অনেক বেশি সচেতন ও সূক্ষ্ম করেছে।

"আগে হয়তো শুধু পারিবারিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে কাজ করতাম, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমাকেনিজের কাজকে বিশ্লেষণ করার নতুন পথ দেখিয়েছে। বইয়ে পড়া অনুপাত ও ভারসাম্যের তত্ত্বগুলো যখন প্রতিমা গড়ার সময়বাস্তবে প্রয়োগ করি, তখন একাডেমিক শিক্ষা ও পারিবারিক ঐতিহ্য একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।"

**প্রতিমা নির্মাণ: শুধু শিল্প নয়, ভক্তির সংযোগ**

আমিও পালের মতে, মাটি, খড়, রং ও অলংকার দিয়ে প্রতিমা তৈরি করা নিছক কোনো অবয়ব তৈরি নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।

পূজামণ্ডপে যখন ভক্তরা ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিয়ে প্রার্থনায় বসেন, তখন একজন শিল্পী হিসেবে কাজটির পূর্ণতা ঘটে এবং এটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার বলে মনে করেন তিনি।

**সময়ের পরিবর্তন ও নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনা**

যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমা তৈরিতেও এসেছে নানাবিধ পরিবর্তন। পুরোনো দিনে যেখানে সব কাজ সম্পূর্ণ হাতে ও প্রচলিত নিয়মে হতো, বর্তমানে নতুন ডিজাইন, আধুনিক রং ও ডেকোরেশনের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। ক্রেতা ও পূজা আয়োজকদের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঐতিহ্যবাহী শৈলীর পাশাপাশি আধুনিক সৃজনশীলতা যুক্ত হচ্ছে।

বর্তমানে তরুণদের মাঝে মৃৎশিল্প বা প্রতিমা তৈরির মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পের প্রতি আগ্রহ কিছুটা কমলেও আমিও পাল মনে করেন, এই পারিবারিক ধারা ও কারিগরি দক্ষতা টিকিয়ে রাখতে নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে।

**আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিমা শিল্পকে পৌঁছানোর স্বপ্ন**

পারিবারিক ১৫০ বছরের ঐতিহ্যকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখতে চান আমিও পাল। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া ঐতিহ্যগত নির্মাণশৈলী ঠিক রেখে সময়োপযোগী প্রযুক্তি, নতুন নকশা ও আধুনিক শৈল্পিক ভাবনা যুক্ত করাই তাঁর উদ্দেশ্য।

তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, বাংলাদেশের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা শিল্পকে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রদর্শনী ও পরিচিতির মাধ্যমে তুলে ধরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলার শিক্ষা ও পারিবারিক ঐতিহ্যের শক্তির ওপর ভর করেই সেই স্বপ্নের দিকে এগিয়ে চলেছেন তরুণ প্রতিমাশিল্পী আমিও পাল।